Showing posts with label বাংলা কবিতা. Show all posts
Showing posts with label বাংলা কবিতা. Show all posts

Sunday, May 31, 2026

ক্লিওপেট্রা

 

ক্লিওপেট্রা || ইমরুল কায়েস

কোন্ উপমায় উপমিত করবো তোমায়, রাণী ক্লিওপেট্রা! তুমি তো নীল নদের বুকে ভেসে থাকা এক অবিনশ্বর শ্বেতস্বর্ণপদ্ম—যার পাপড়িতে জমা ছিল সাম্রাজ্যের গৌরব, রাজনীতির প্রজ্ঞা, অর্থনীতির জটিল সমীকরণ এবং প্রেমের গভীরতম দীর্ঘশ্বাস।

তোমাকে মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশরের উন্মুক্ত আকাশ; যেখানে পিরামিডগুলো দাঁড়িয়ে আছে জমাটবাঁধা সময়-পর্বতের মতো, আর তাদের নীরবতার মধ্যে তোমার পদধ্বনি আজও প্রতিধ্বনিত হয়।

তুমি ছিলে মরুভূমির মাঝে জন্ম নেওয়া এক অলৌকিক মরূদ্যান। তোমার সৌন্দর্য কেবল শরীরে কিংবা অবয়বে ছিল না; তা ছিল এমন এক দুর্দমনীয় চৌম্বক শক্তি, যা রোমের শক্তিশালী সম্রাটদেরকেও নিজের কক্ষপথে অনায়াশে টেনে আনতে পারতো। তোমার দৃষ্টি ছিল স্ফিংক্সের রহস্যের মতো গভীর, যেখানে ইতিহাস তার অপ্রকাশিত অধ্যায়গুলো লুকিয়ে রাখতো। তোমার কন্ঠের হায়রোগ্লিফিক্স, নীল নদের স্রোতের মতো—কখনো শান্ত, কখনো প্রবল, কিন্তু সর্বদা সঞ্জীবনী শক্তির আধার।

যখন রোম তার ঈগল-ডানা মেলে পৃথিবীকে গ্রাস করতে চাইছিল, তুমি তখন ছিলে অস্তগামী সূর্যের শেষ সোনালি রেখার মতো—ক্ষণস্থায়ী অথচ বিস্ময়কর। তোমার মধ্যে জুলিয়াস সিজার  দেখেছিলেন রাজনীতির প্রখর বুদ্ধিমত্তা; মার্ক অ্যান্টনি খুঁজে পেয়েছিলেন হৃদয়ের অতল সমুদ্র। কিন্তু, তুমি তাদের কারোরই ছায়া ছিলে না; তুমি ছিলে নিজেই একটি স্বর্ণযুগ, একটি অহঙ্কারী সভ্যতা, একটি স্বতন্ত্র প্রভাবশালী নক্ষত্রমণ্ডল।

তোমার প্রাসাদ পাথর ও স্তম্ভের সমাবেশ ছিল না কেবল; তা ছিল জ্ঞানের উদ্যান, যেখানে দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মনময় শিল্প-কবিতা একই আকাশের নিচে প্রস্ফুটিত হতো। তোমার চিন্তা ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের মতো বিস্তৃত; যতই তাকে পড়া যায়, ততই নতুন নতুন কক্ষ উন্মোচিত হয়। আজ পিরামিডের গায়ে সহস্র বছরের ধুলো জমেছে। এখন রোমান সাম্রাজ্যের স্থান হয়েছে ইতিহাসের পাতা। বিজয়ী বীরদেরদের তলোয়ারে ধরেছে মরিচা। কিন্তু, তোমার নাম এখনও বেঁচে আছে, স্বমহিমায়। কারণ কিছু মানুষ রাজ্য শাসন করে, আর কিছু মানুষ শাসন করে প্রবাহমান সময়কে।

ক্লিওপেট্রা, তুমি ছিলে সেই বিরল ভাগ্যবতীদের একজন, যার জীবন ইতিহাসের বুকে ধূমকেতুর মতো জ্বলেছে—ক্ষণিকের জন্য নয়, যুগের পর যুগ আকাশকে আলোকিত করার জন্য। তোমার কীর্তি আজো নীল নদের জলে ভাসমান চাঁদের প্রতিবিম্বের মতো; স্পর্শ করা যায় না, অথচ ভুলে যাওয়াও যায় না। তোমার স্মৃতি যেন প্রাচীন মিশরের বালুকণায় লুকিয়ে থাকা এক স্বর্ণমুদ্রা; যতবার ইতিহাস তার মুঠো খুলে দেয়, ততবার নতুন দীপ্তিতে জ্বলে ওঠে তোমার নাম— ক্লিওপেট্রা।

৩০ মে ২০২৬ খ্রি. || ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ব.
কিছুক্ষণ, খুলনা, বাংলাদেশ


Friday, May 29, 2026

বিদ্রোহী কবি নজরুল

 

বিদ্রোহী কবি নজরুল
ইমরুল কায়েস
বাংলার সাহিত্যাকাশে তুমি এসেছিলে
ধুমকেতুর মতো, অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ হয়ে,
অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকা এক দিক-ভ্রান্ত জাতির বুকে
পাহাড় ফাঁটা বজ্রের শব্দ হয়ে।
তোমার কণ্ঠে ছিল মহাবিদ্রোহের টর্নেডো,
আর পাললিক হৃদয়ে ছিল প্রদীপ্ত প্রেমের নরম বৃষ্টি।
তুমি শিখিয়েছিলে—
মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই আর।
হে সাম্যর কবি নজরুল, এই অস্থির পৃথিবীতে
তোমার কলম কখনো হয়েছে তলোয়ার,
কখনো আবার প্রার্থনার পবিত্র দীপশিখা,
মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিকে
তুমি একই আকাশের নীচে
একই ছন্দে-তালে মিলাতে চেয়েছিলে।
তোমার কবিতায় ধর্ম ছিল মানবতার আরেক নাম,
আর ভালোবাসা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সত্য।
যখন জালিমের খড়গ উঁচু হয়ে উঠেছিল,
তুমি বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়িয়েছিলে মানুষের পাশে।
তোমার গানে জেগে উঠেছিল শিকলবন্দী প্রাণ,
তোমার গানে কেঁদেছিল নিঃস্ব মানুষের হৃদয়।
হে মানবতার কবি, তুমি শুধু কবি নও—
তুমি এক অনিঃশেষ অগ্নিশিখা, জাগরণের নাম
যে নাম অজস্র তরুণ হৃদয়ে
স্বাধীনতার স্বপ্ন জ্বালিয়ে রেখেছে আজো...
বাংলার আকাশে যতোদিন ভোরের আলো ফুটবে,
ততোদিন তোমার কবিতা নদীর মতো বয়ে যাবে
বিপ্লব-স্পন্দিত অজস্র বাঙালির মুখে মুখে।
শিশিরভেজা সকালে, আঁধার-রাঙা সন্ধ্যায়,
প্রেমে, দ্রোহে আর প্রতিবাদে—
তোমাকেই ফিরে পাবে অহঙ্কারী বাংলা।
হে বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি নজরুল
তোমার নাম উচ্চারণ করা মানে
হিমালয়ের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো,
তোমাকে স্মরণ করা মানে
শৃঙ্খল ভেঙ্গে সামনে এগোনোর অদম্য সাহস,
শ্রেণিহীন, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায়
দেশ গঠনের এক প্রদীপ্ত শপথ...
২৩ মে ২০২৬ খ্রি. || ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ব.
খুলনা

Friday, May 8, 2026

কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইমরুল কায়েস

ভোরের শিশিরভেজা নরম রোদের মতো
ভেসে আসে তোমার গান, কেঁপে ওঠে সুনির্মল বাতাস—
‘আমার সোনার বাংলা’র সুরে, অজানা গহীন সুদূরে
শুনতে পাই নতুন দিনের নতুন আহ্বান।
হে কবি গুরু, বাঙালির অহঙ্কার,
তুমি শুধু কবি নও, তুমি কবিদের কবি।
তুমি কবির হৃদয়ে আঁকা এক অবিনশ্বর ছবি,
বাংলার সাহিত্যাকাশে তুমি এক অনন্ত নক্ষত্র।
তোমার কবিতা মানে নদীর ঢেউ, শিউলি-ঝরা ভোর,
কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা প্রেম, মানব-মুক্তির মন্ত্র
আটপৌরে বাঙালির পরাবাস্তব স্বপ্ন।
হে অগ্রজ কবিবর, আজ তোমার শুভ জন্মদিনে
গঙ্গা-পদ্মার জলতরঙ্গ গেয়ে ওঠে প্রশান্তির গান,
ভোরের শালিক ডাকে ছাতিমের ডালে,
তোমার স্বেতশ্মাশ্রুর মতো কাশফুলের কোমল প্রাণ
দুলে ওঠে বারবার নবগঙ্গা তীরে।
তোমার “গীতাঞ্জলি”র প্রতিটি পঙক্তি
বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অন্ধকারে পথ হারালে
তোমার অভিজাত শব্দকাহন আলো হয়ে জ্বলে ওঠে।
তোমার কবিতায় তুমি শিখিয়েছো...
কবিতা মানে শুধু একগুচ্ছ শব্দের সমাহার নয়,
অজস্র জীবনের বুদবুদ...
ভালোবাসা মানে শুধু কাছে পাওয়া নয়,
হৃদয়ের দরোজা খুলে দেওয়া, সৌরভ ছড়ানো...
স্বাধীনতা মানে
মাথা উঁচু করে সত্যের পথে অবিরাম হেঁটে চলা।
হে কবি সম্রাট, রবীঠাকুর
এই খররৌদ্রদগ্ধ তপ্ত বোশেখে, তোমার জন্মদিনে
শ্রদ্ধার শরোবরে শুভ্র পুষ্পাঞ্জলি ভাসালাম...
যতদিন বেঁচে থাকবে বাঙালি ও বাংলা ভাষা
ততদিন বেঁচে থাকবে তোমার কবিতা,
বাঙালির মননে, হৃদয়ের গহীনে, হৃদ-স্পন্দনে।
০৮ মে ২০২৬ খ্রি.
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩ ব.
খুলনা

Monday, April 27, 2026

আসসালাম স্বাগতম হে রাসুল (স.)

 


আসসালাম স্বাগতম হে রাসুল (স.)
ই ম রু ল কা য়ে স
আসসালাম, স্বাগতম, হে রাসুল (স.)
হাশরের ময়দানে যেন পাই তোমার সাফায়াত।
আঁধার যখন তাবৎ পৃথিবী চেয়েছিল গিলে খেতে
নৈতিকতা ভেসে গিয়েছিল অবক্ষয়ের স্রোতে
ঐশি আলোর ঝর্ণা হয়ে রবের আরশ থেকে
তখন তুমি নেমে এলে এ পাপের ধরণীতে।
যখন পাপে ডুবে গিয়েছিল আরবের মসনদ
ঘরে ঘরে ছিল নগ্ন নৃত্য, সুদ ঘুষ জুয়া মদ
পাপের সাগর আরব জাহান যখন দিশাহীন
তখন তুমি তাদের দেখালে নতুন আশার পথ।
বিবেক যখন পরাজিত হলো, মূর্তি হলো চালক
অন্ধকারে নিভে গিয়েছিল সভ্য জাতির আলোক,
যখন আরব অসহায় ছিল লালসার কাছে হেরে
তখন তুমি প্রেরিত হলে, দেখালে রবের ঝলক।
আসসালাম, স্বাগতম, হে রাসুল (স.)
তুমি আমাদের আলোকের পথ দেখাও।
যখন তুমি প্রেরিত হলে খুললো বন্ধ দ্বার
বিতাড়িত হলো সমাজের মাঝে গুমোট অন্ধকার
তুমি দেখালে সোনার আলোয় উদ্ভাসিত ভূবণ
তোমায় পেয়ে থেমে গেলো ধূধূ মরুর হাহাকার।
তুমি এনে দিলে ঐশি কিতাব পবিত্র ‘আল কুরআন’
মানব জাতির জীবনাদর্শ , পূর্ণ জীবন বিধান
তুমি পড়লে, ‘ইকরা বিইসমি রাব্বিকাল্লাজি খলাক’
শোনালে যখন , আনলো ঈমান সমগ্র আরব জাহান।
বন্ধ হলো মূর্তি পুজো, দেহ পুজোর স্বপ্ন বিলাস
তিক্ত নষ্ট অতীত ভুলে সৃষ্টি হলো নতুন সমাজ
মূর্তিগুলো নত হলো খুলে ফেলে আলখাল্লা
ঘোষণা দেয় মালিক মোদের অদ্বিতীয়, এক আল্লাহ।
আসসালাম, স্বাগতম, হে রাসুল (স.)
তুমি আমাদের বেহেশতের পথ দেখাও।
তুমি না এলে সৃষ্টি হতো না পৃথিবী চন্দ্র তারা
তুমি না এলে মিষ্টি হতো না মানব জীবন ধারা
তুমি না এলে কে আমাদের এনে দিতো রহমত
তুমি না এলে কে চিনাতো নাজাতের সরু পথ?
শেষ বিচারে পুলসেরাত আর হাসরের ময়দানে
তোমার আশীষ যেন পাই যেতে স্বর্গের উদ্যানে
তোমাকে ছাড়া পাবো কি বেহেশত, কে দেখাবে দিশে
পাবো কি নাজাত, ছুটবো কোথায় মুক্তির সন্ধানে?
মানবতার পথপ্রদর্শক নবীকূল শিরোমনি
তুমিই মোদের হৃদস্পন্দন, মমতার মহাখনি
শেষ বিচারে যখন আমরা হয়ে যাবো জড়সড়
পাপের হিসেব ছোট করে দিও, পূণ্য দেখাইও বড়।
আসসালাম, স্বাগতম, হে রাসুল (স.)
হাশরের ময়দানে যেন পাই তোমার সুপারিশ।
(পবিত্র সিরাতুন্নবী (স.) উপলক্ষে রচিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ)

অবুঝ রাখাল ও তার রক্তাক্ত স্বপ্ন

 

অবুঝ রাখাল ও তার রক্তাক্ত স্বপ্ন
ইমরুল কায়েস

এক স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের বাড়ির আঙিনায়
অনেক যত্নে গড়ে ওঠেছিল একটি ফুল বাগান
দীর্ঘ সাক্ষাৎকার শেষে সেই বাগানের মালির দায়িত্ব
দেওয়া হয় এক স্বপ্ন বিলাসী রাখালের উপর।
রাখাল মালির অক্লান্ত শ্রম আর তিল তিল ভালোবাসায়
দ্রুত বড় হয়ে উঠলো চারাগাছ।
বসন্তের প্রথম প্রহরে সেই চারাগাছে ফুটলো ফুল
ফুলের বর্ণে-গন্ধে-সৌন্দর্যে রাখাল হয়ে উঠলো ব্যাকুল।
মাঝে মাঝে সবার অজান্তে ফুলের ঘ্রাণ শুকতো সে
মালির নিঃশ্বাসে কেঁপে উঠতো ফুলের কুমারী দেহ-মন
নির্জনে, নিঃসঙ্কোচে সেও মেলে দিত পাপড়ি।
একদিন এক অবাঞ্চিত দুঃসাহস বুকে নিয়ে
বাগানের মালিকের কাছে অবুঝ মালি চেয়ে বসলো-
সর্বকনিষ্ঠ ও সুদৃশ্য, মায়াময় মোহনীয় ফুলটি।
মুহূর্তে রক্তাক্ত হলো রাখাল মালির অবুঝ স্বপ্ন।
চিরকালের জন্য তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো
মোহনীয় সেই সুদৃশ্য ফুল ছোঁয়ার নিঃষ্পাপ অধিকার।

২৩ আগস্ট ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ
০৮ ভাদ্র ১৪১০ বঙ্গাব্দ
খুলনা।

পাখি

 

পাখি 🐦
ইমরুল || কায়েস
আমার একটি পোষ না মানা পাখি আছে।
পাখিটা যে ভীষণ অদ্ভুত; অভিমানী, মেজাজ গরম।
উৎপাতে তার উদাস কবির বিশ বসন্ত অম্লমধুর।
সেই পাখিটা অল্প অল্প কাব্য বোঝে। বোঝে বলেই
উদাস কবির হেরেম ছেড়ে বসে না সে অন্য ডালে...
সেই পাখিটা কাছে থাকলে উৎপাতে হৃদ-প্রেসার বাড়ে
থালা ঝনঝন, মাথা ভনভন, ধ্যান-ভঙ্গ বাউল কবির।
দূরে গেলেই নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ডুবে মরি
গ্রাস করে ব্যথার ধোঁয়া, ছন্দ হারায় ভাবনাগুলো।
পাখি যখন কাছে থাকে শূন্যতাটা বোঝা যায় না।
দূরে গেলেই হৃদয় আমার নিঃসঙ্গতার সাইবেরিয়া,
দূর সাহারায় তখন আমি নিঃসঙ্গ এক দুঃখের কবি।
মাঝে মাঝে দূর আকাশে পাখি আমার পাখনা মেলে,
ফিরে আসে সতেজ হয়ে নতুন রুপে শিষমহলে,
বিরহে তার কলকাকলি মুহূর্তে হয় পঙক্তিমালা।
সেই পাখিটা এমন পাখি, মেজাজ চড়া কিন্তু খাঁটি!
আচ্ছা ভাই- বলুন দেখি, পাখিটা কি নুনের বাটি?
পাতে থাকলে উপস্থিতি যায় না বোঝা,
না থাকলে শূন্যতাটা হয় অনুভব, তীব্রভাবে!

লিকলিকে মেয়ে ০৮

 

কবিতা || লিকলিকে মেয়ে ০৮
ইমরুল কায়েস

লিকলিকে মেয়ে
এই শহরে তুমি নাকি আবার এসেছো ফিরে!
তোমার আগমনে শহরে নেমেছে সাইবেরিয়া
কমে গেছে তাপমাত্রা; শীতে কাঁপছে দিন-মজুর,
কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে এখানের জনপদ,
দাঁতে দাঁতে বাড়ি লাগছে আমারও;
তবু শুধু একটিবার তোমাকে দেখার জন্য
মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে আছে।
তোমাকে দেখার স্বপ্নে তছনছ দিনের কর্ম-তালিকা
অথচ তুমি জানালা দরোজা বন্ধ করে বসে আছো ঘরে!
বার্মিংহামে বৃষ্টি হচ্ছে। সাটন পার্কে নীরব সন্ধ্যা ;
কারাকাসের ট্রাম্প নাটক দেখতে এখন সবাই ব্যস্ত,
পুতিন ঝড়ে বিধ্বস্ত ওডেসা বন্দর,
ইরানে চলছে খামেনি নামাও বিপ্লব!
আমি শুধু তোমাকে দেখার পুরনো স্বপ্নে বিভোর।
সীমাহীন ব্যস্ততা অক্টোপাসের মতো বেঁধে রেখেছে
কষাঘাতে ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্চি ভিতোরে, গহীনে।
তুমি অনুমতি দিলেই যে কোনো সময়
তোমার সামনে এসে দাড়াতে পারি।
০৮ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
খুলনা


প্রথম প্রেম, লাজুক সন্ধ্যা

 

প্রথম প্রেম, লাজুক সন্ধ্যা
ইমরুল কায়েস

এই সন্ধ্যার স্নিগ্ধ হাওয়ায়
ভেসে আসে তার কুমারী চুলের সঞ্জিবনী গন্ধ,
বুনো বাতাসে ছুটে আসে তার মায়াবী হাসি।
আমরা দু'জন আনমনে হেঁটে চলি মধুমতি তীরে।
প্রতিটি পদক্ষেপে অজস্র না বলা কথা;
কথাগুলো অনাদিকালের পঙক্তিমালা সাজায়।
তার চোখে আমি বুনি অজস্র স্বপ্নবীজ,
আমার চোখে সে কি খোঁজে, আমি ঠিক জানি না!
সেই সব স্বপ্নের গল্প লেখা হয়নি এখনও,
কিন্তু জানি, তা চিত্রিত হয়েছে বহু প্রচ্ছদে, বহুবার।
চাপা আনন্দ, উৎকণ্ঠা ভরা দু’টি প্রাণ,
সেই ছোট্ট নির্বাক মুহূর্তের অনুভূতি সাথে নিয়ে
আমি চুপচাপ হেঁটে চলি—
সে আছে তাই চালু আছে আমার হৃদ-স্পন্দন;
কবিরা নারীর কাছে বার বার হেরে যায়, হারতে হয়!
নারীরা কবিকে কষ্ট দেয়, কবির কষ্ট চুঁষে নেয়!
রাতের অন্ধকারে থোকায় থোকায় তারা ঝলমল,
আমাদের কণ্ঠে ভাসে নিঃশব্দ প্রেমের মেলোডি।
এই বিরহী সন্ধ্যা, এই স্নিগ্ধ বাতাস, এই বহমান নদী;
সব কিছু এক সাথে, বিমূর্ত স্মৃতির তুলি হাতে
রঙিন ছবি আঁকে হৃদয়ে ; সারাদিন, বিরতিহীন।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০২ খ্রি.
খুলনা

আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুরে (এক)

 

আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুর
ইমরুল কায়েস
আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুর
তোকে আজ খুব মনে পড়ছে?
আমার না ভোলা শৈশব তোর সাথে মিশে আছে।
তুই ছাড়া এখন ভীষণ একা লাগে, বন্ধু।
তোকে আর নাম ধরে ডাকতে পারছি না
কারণ তুই এখন আর নাম নয়, কেবলই স্মৃতি।
আমার খুব মনে পড়ে, একই বেঞ্চে বসে
খাতা-পেন্সিল ভাগ করে নেওয়ার সেই দিনগুলো?
আমার কলম হারালে তুই বলতিস,
“ আমারটা নে, পরে ফেরত দিলেই হবে”—
আজ তোকে ফেরত দেওয়ার
সেই সুযোগ টুকুই আমার হাতে নেই।
তুই ছিলি আমার খেলার সাথী, পড়ার সাথী
আমার কী করতে হবে, কী বলতে হবে
চোখের এক ইশারায়, সব তুই বুঝিয়ে দিতি।
আজ আমি ইশারা করি আকাশের দিকে—
কিন্তু তুই আর তাকাস না!
তুই মিশে গেছিস আকাশ নীলে, দূর দিগন্তে।
খেলার মাঠে বিসর্জন দেওয়া অজস্র বিকেলগুলো,
হাসতে হাসতে বাড়ি ফেরার অসংখ্য মুহূর্তগুলো,
আমাকে এখন ভীষণ যন্ত্রণা দেয়, বন্ধু !
মাঝে মাঝে অভিমানে কথা বলা বন্ধ হতো ,
কিন্তু, সে সব ভুলে আবার দু'জনে মিলে যেতাম।
অবারিত ফসলের মাঠে, অর্থহীনভাবে
অগুন্তি সময় কাটিয়েছি তোকে নিয়ে।
তুই নেই, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো, সেই মুহূর্তগুলো
আমাকে একা পেয়ে এখন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়!
সীমাহীন ব্যস্ততার কারণে শেষ দিকে
তোর সাথে আমার দেখা ও কথা হতো কম।
ভেবেছিলাম আবার বসবো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কখনো ভাবিনি, সম্পর্ক ঠিক হওয়ার সেই সুযোগটাই
এভাবে একদিন একদম ফুরিয়ে যাবে!
ওবায়দুর, তুই তো জানিস,
আমি খুব একটা শক্ত মনের মানুষ না।
কিন্তু তোর চলে যাওয়ার পর
আমাকে অনেক শক্ত হতে হচ্ছে—
কারণ কাঁদলে—তুই এসে বলতিস, “কাঁদিস না,
সব ঠিক হয়ে যাবে।”
শেষবার তোর ফোন নম্বরটা
যখন আমার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল ,
আমি খুবই ব্যস্ত ছিলাম, সেদিন।
ভেবেছিলাম, পরে মন খুলে কথা বলবো।
কী ভয়ঙ্কর মিথ্যে ভাবনা ছিল আমার
“পরে” আর কখনো ফিরে আসেনি।
মনের ভিতরে তোর জন্য যে জায়গা ছিল
সে জায়গাটা এখন আর খালি নাইরে,
জায়গাটা এখন ব্যথায় ভরা;
নীরবতায়, অপূর্ণতায় ও শূন্যতায়।
এমন কিছু কথা বুকের মধ্যিখানে মিছিল করে
যা তোকে ছাড়া আর কাউকে বলা যায় না।
যদি ওপার থেকে তুই দেখতে পারিস, দেখিস—
যদি ওপার থেকে শুনতে পারিস, শুনিস,
আমি এখনো আগের মতোই আছি,
শুধু স্মৃতির ভিতরে আমি তোকে খুঁজে বেড়াই।
ওপারে শান্তিতে থাকিস, বন্ধু
বিমর্ষ পৃথিবীতে এ আমার একমাত্র প্রার্থণা।
স্মৃতি বড় বেদনার, স্মৃতি বড় যন্ত্রণার।
মনে হয় বেঁচে থেকেও এই আমি
তুই না থাকার করুণ যন্ত্রণা অনুভব করছি।
২৩ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
খুলনা।

আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুর (দুই)

 



আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুর (দুই)
ইমরুল কায়েস
আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু ওবায়দুর
এই মুহূর্তে তোর নামটা ভীষণভাবে মনে পড়ছে!
শৈশবের উঠোনে শুয়ে আছে বিমর্ষ অতীত
স্মৃতিগুলো অবিরত ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষাদের ঘ্রাণ।
মনে আছে ওবায়দুর
খেলার মাঠে কাটানো সেই মিষ্টি মধুর সময়গুলো?
তেমন কোনো কর্ম ছিল না তখন,
কিন্তু, স্বপ্ন ছিল দু’জনের চোখে- মুখে ঠাঁসা।
আমাদের অজস্র অট্টোহাসির বিকেলগুলো
মনের মাঝে অগুনতি স্বপ্ন বোনার প্রহরগুলো
হা-ডুডু, ফুটবল ও দাড়িয়াবান্ধার ছত্রগুলো ;
ধুলোমাখা হাত-পা, ভাঙা কাঁচের মার্বেল,
ফলাফল ভালো করার মধুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা
বারবার শব্দ করে আমাকে এখনো ডাকে,
“দোস্ত, আয় তো একটুখানি খেলে আসি”।
ওবায়দুর,
বিকেল হলেই এখনো আমি তোর ডাক শুনতে পাই,
কিন্তু তোকে যে চোখে দেখতে পাই না!
সেই একই আকাশ এখনো দেখি,
সেই একই সূর্যের ওঠা-ডোবা দেখি প্রতিদিন,
স্মৃতিময় জায়গাগুলোতে তোকে দেখতে পাই না আর!
তোকে ছাড়া জীবন এখন অসম্পূর্ণ লাগে।
তোর অজস্র কথোপকথন আটকে আছে আমার কণ্ঠে,
চোখের কোণে জমে আছে তোর নিষ্পাপ দৃষ্টি।
ওবায়দুর,
তুই ছিলি আমাদের সময়ের সবচেয়ে সহজ মানুষ।
কোনো অভিনয় ছিল না তোর মাঝে,
ছিল শুধু আস্থার নিশ্চয়তা।
আজ সেই আস্থার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
আমরা এক সাথে বড় হইনি শুধু,
এক সাথে কেঁদেছি, এক সাথে হেসেছি
এক সাথে না খেয়ে খেলেছি সময় পেলেই,
একই কারণে মায়ের বকুনি খেয়েছি বহুবার।
আমার কান্নার সুর সবার আগে তুই শুনতিস,
এখন আমার কান্নার রোল শোনার কেউ নাই।
তোর হাসিটা ছিল অদ্ভুত রকমের সহজ
যেন দুঃখ নামক শব্দটাই তোর অভিধানে ছিল না।
তোর সেই হাসিমুখের ছবিটা
বুকের ক্যানভাসে আঁকা আছে খোঁদাই করে।
ওবায়দুর, এখন তোর নামটা উচ্চারণ করলেই
আমার শৈশবটা খানখান করে ভেঙে পড়ে—
ভাঙা খেলনা, ভেজা চোখ, টুকরো স্মৃতি
আর কিছু অসমাপ্ত কথা, ভুলি কী করে বল?
ওবায়দুর, তুই যে নেই—
এই কথাটা মানতে আমার কষ্ট হয়, সময় লাগে।
কারণ কিছু মানুষ মরে না,
তারা শুধু অসহ্য নীরবতা হয়ে বুকের মাঝে বেঁচে রয়।
আমি এখনো বুকের ভিতোর
তোর জন্য একটা জায়গা রেখে দিয়েছি,
তোর শৈশবটা তুই নিজে
আমাকে নামপত্তন করে গেছিস।
মৃত্যু তোর শরীর কেড়ে নিয়েছে ঠিকই,
কিন্তু, নিতে পারেনি তোর শৈশব,
তুই আছিস আমার গল্পে, স্বপ্নে আর স্মৃতিতে ,
আমার নিঃশ্বাস, বিশ্বাস ও নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে।
মানুষ মাত্রই মরে যায়,
মরে না তার রেখে যাওয়া স্মৃতি, খুনসুটি
কিছু মানুষ মরে গিয়েও বেঁচে থাকে মানুষের ভীড়ে।
আমাদের না ভোলা অতীত স্মৃতিতে
তুইও আগের মতোই বেঁচে আছিস, বন্ধু
এবং বেঁচে থাকবি হয়তো অনন্তকাল।
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
খুলনা

শবে বরাত, আমার প্রার্থনা

 


শবে বরাত, আমার প্রার্থনা
ইমরুল কায়েস
আজ পবিত্র শবে বরাত, মহিমান্বিত রজনী।
আকাশ ভরা ঐশী আলোর হাতছানিতে
মাতোয়ারা সমগ্র মুসলিম জাহান,
অজস্র তারার ভীড়ে রহমতের পেয়ালা নিয়ে
সুবহে সাদিক পর্যন্ত অপেক্ষায় আছে ফেরেশতারা।
স্নিগ্ধ বাতাসে ভেসে আসছে দোয়ার মিনতি,
ক্ষমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা গুনাহগার।
হে আমার রব, হে আমার প্রদীপ্ত প্রতিপালক,
এই মহিমান্বিত রজনীর উসিলায়
তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও। তোমার রহমতের
শামিয়ানায় আমাদের স্থান করে দাও।
দু’চোখে অশ্রু নিয়ে, দু’হাত প্রসারিত করে
তোমার আরশে এ আমার পবিত্র প্রার্থনা।
এই পবিত্র রাত, লিখে দেয় তাকদীরের খতিয়ান,
ভুলে ভরা জীবন, ফিরে পেতে চায় কুরআনের পথ,
হে আমার ক্ষমাশীল প্রতিপালক,
ক্ষমা করো আমাদের সমস্ত ভ্রান্তি,
হৃদয় প্রান্তরে ঢেলে দাও অবিরাম রহমতের বর্ষণ।
মসজিদের মিনারে আজ কান্নার সুর বাঁজে,
সিজদায় নত আছে অজস্র সমর্পণকারী
গৃহে গৃহে আল কুরআনের অনুরণন শুনছি।
হাত তুলে, প্রাণ খুলে, ক্ষমা চায় তোমারই বান্দা—
হে পরম করুণাময়, সার্বজনীন ভাগ্য-বিধাতা
হৃদয় থেকে আমার সমস্ত অন্ধকার তুলে নাও,
ললাটে এঁকে দাও ক্ষমা ও রহমতের মহিমা;
মনের আঙিনা ভরে উঠুক তোমার নূরের ঝর্ণাধারায়।
অনুপম পূর্ণতায়...
তুমি লিখে দাও আমার এই জীবনের সাওদা।
এই পবিত্র রজনীতে ফরিয়াদ শোনো, হে প্রভু
তুমি আমাদের রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত দাও।
পাপের প্রশস্ত সাগর ছেড়ে তুমি আমাদের
আলোর পথে ফিরে আসার ঈমানী শক্তি দাও।
এই পবিত্র রাত হোক বদলে যাওয়ার অঙ্গীকার,
তোমার রহমতে ভরে উঠুক জীবনের প্রতিটি ভোর,
অন্ধকার ঘুঁচে যাক সমগ্র জিন্দেগীর
এই পবিত্র রজনীতে
আমি আমার মৃত স্বজনের গুনাহ মাপের জন্য
বিনম্র চিত্তে মিনতি করছি,
হে আমার রব, তুমি তাদেরকেও ক্ষমা করে দাও।
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানী সগিরা
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানী সগিরা।
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
শবে বরাত
খুলনা

মা, তুমি আছো আমার প্রার্থনায়

 

মা, তুমি আছো আমার প্রার্থনায়
ইমরুল কায়েস
আকাশটা আজ ভীষণ নীরব, অন্যরকম
বাতাসে কেবলই তোমার ডাক শুনছি—মা।
তোমার শূন্যতা ঘরজুড়ে, জীবন সংসার জুড়ে;
মনের ক্যানভাসে শুধুই তোমার স্মৃতির মেঘমালা।
যে হাতে ছিল মমতার ছোঁয়া, সেই হাতখানা খুঁজছি
আজ দোয়ার আকাশে ভেসে উঠছে তোমার মুখ
ঘুম পাড়ানো গল্পগুলো, কান্না-হাসির স্মৃতিগুলো
এখনো কানে বাজে মা, তোমার পবিত্র নিঃশ্বাসে।
তুমি ছিলে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন
জীবনের প্রথম আলো, প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিশ্বাস,
প্রতিটি ক্লান্ত সন্ধ্যায় তুমি মিশে আছো, মা
তোমার নামটাই এখন আমার প্রেরণার নিঃশ্বাস।
তুমি আজ নেই, তবু মনন আকাশ জুড়ে
শুধু তোমারই মায়াবী মুখের ছবি সাটানো
আমার সেজদায়, আমার চোখের জলে,
ভেসে ওঠে কেবলই তোমার প্রতিচ্ছবি।
হে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন
তুমি আমার মা জননীকে জান্নাত নসিব করো।
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।
০৭ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
খুলনা