ইমরুল কায়েস
মনে করাও-এখনো তুমি ভালোবাসো আগের চেয়ে ঢের বেশি।
এই ভেবে নিজের প্রতি আমি ভীষণ বিরক্ত হই; মনে হয়
ইট-পাথরের সংসার ছেড়ে, চাকরি ছেড়ে, শহর ছেড়ে
তোমার ডাকে সাড়া দেই, তোমার বুকেই ফিরে যাই আবার।
এক অদৃশ্য সর্বগ্রাসী মায়াবী টান—
চোখ বন্ধ করলেই তুমি বাহির থেকে ভিতোরে আসো
তোমার ভেজা মাটির গন্ধ, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির,
মায়াবী শ্যামলিমা, আমাকে অনবরত টেনে নেয়।
চোখ বন্ধ করলেই টেনে নেয় ইছামতি বিল
লক্ষ্মীকাজল, লক্ষ্মীলতা, নোড়উ, বাকতুলশি,
বালাম, বোয়ালে এবং পরাঙ্গি ধানের মৌ মৌ গন্ধ।
চোখ বন্ধ করলেই এখনো আমার নাকে এসে শুঁড়শুঁড়ি দেয়,
ডাঁসা ডাঁসা কদম ফুল, ঘরের কোণায় শিউলি ফোটা,
কানে ভাসে পরিচিত হাজার পাখির ডাক;
কোথায় তোমার কই, মাগুর আর শোল, টাকি,
পাবদা, পুটি, রয়না, গুতুম?
অবিবেচক গ্রামবাসীর অত্যাচারের পরেও তুমি
মায়ার টানে আগলে রাখতে এই আমাদের
এই পারেতে বড়শি হাতে আমি থাকতাম
ঐ পারেতে জলচৌকিতে থাকতো বন্ধু ওবায়দুর,
মাছ ধরার টুকিটাকি, গল্পগুজব. খুনসুটি!
সন্ধ্যা হলেই মায়ের ছোঁড়া, মধুমাখা সেই কণ্ঠ—
“খোকা এখন বাড়ি আয়, সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এলো!”
জন্ম নিতেই, তুমি আমার কান্না শুনেছো
হামাগুড়ি আর হাঁটতে দেখোছো
তোমার মাটিতে লেপটে আছে আমার পায়ের প্রথম ছাপ,
তোমার মাঠে আমার প্রথম দৌড়,
তোমার জলে আমার প্রথম সাঁতার,
তোমার মানুষের ভিড়েই আমার প্রথম আপনজন চেনা।
সময়ের বাঁকে বাঁকে পড়ে আছে সেইসব ফেলে চিত্রকল্প
স্মৃতিগুলো আজো তুমি মায়ের মতো
নিজ আঁচলে পরম স্নেহে বেঁধে রেখেছো।
বর্ষার দিনে যে পথ কাঁদায় মাখামাখি হয়ে যেত,
বর্ষাকালে লুঙ্গি পরে, খালি পায়ে স্কুলে যাওয়া-আসা
কাঁদার ভিতোর চলতে চলতে হঠাৎ আঁছাড়!
স্মৃতির ফেমের হাজার রঙের সেইসব দিনগুলো কই?
কোথায় এখন মাছ ধরার সেই মহোৎসব!
আউশের ক্ষেত পরিষ্কার করে তৈরি হতো খেলার মাঠ
যেখানে বিকেল নামলেই নেমে আসতো ফুটবলের মহোৎসব,
হারুণ চাচার বাড়ির সামনে খালের পাড়ে দাঁড়িয়াবান্ধা,
হোসেন চাচার কুয়োর পাড়ে হিজল গাছের ডালে ডালে
পাড়াশুদ্ধ দুষ্টু ছেলের মিলন মেলা, লম্ফঝম্প।
খেলার মাঠে সন্ধ্যা এলে বলতো সবাই—
“আরেকটু খেল, সন্ধ্যা একটু পরে আসুক”
সেই ‘আরেকটা’ কতখানি দীর্ঘ ছিল এখন বুঝি।
যাদের সাথে কাটানো এক একটি বিকেল
সেইসব খেলার সাথীরা কেউ আজ শহরে, কেউ দূর প্রবাসে,
কেউ হয়তো সংসারের ঘাণি টানতে টানতে
ঝামারঘোপের বুড়ো বটগাছটার কথা মনে পড়ে?
গাছের নীচে বসে থাকা বয়স্ক মানুষগুলো গল্প করতো,
তাঁদের মুখে ছিল গাও-গ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য,
চোখে ছিল বহু শীত-বসন্ত পার হওয়ার শ্রান্তি-শান্তি।
চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবি—
জীবন যত দূরেই নিয়ে যাক আমাকে,
যতো শহর, যতো আলো, যতো অচেনা পথ
আমার সামনে খুলে যাক—
সাঁঝের বেলায়, হৃদয়ের এক কোণে
নিরবে জ্বলে একটি চেনা প্রদীপ
যার নাম—কলাগাছি।
যদি একবার ফিরে পেতাম সেই পুরনো শৈশব, সেই কৈশোর;
সেই মেঠোপথে, সেই পুকুরঘাঠে, ইছামতি বিল
সেই খালপাড়, মাছধরার গোন
যেখানে তাড়া ছিল না, ঘড়ি ছিল না
ছিল শুধু আকাশসম সম্ভাবনার শৈশব।
সবাই ছেড়ে দেবে আস্থার হাত, সটকে যাবে দৃষ্টির বাহিরে,
যেই দিন খুঁজে পাবো না কাছের বন্ধুদেরও—
তুমি দু’হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নেবে তো?
খুলনা






.jpg)



